আজ : ১১:১৭, জুন ৩ , ২০২০, ২০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭
শিরোনাম :

দান খয়রাতের প্রতি অতি নির্ভরশীলতাই প্রান্তিক মানুষের ভঙ্গুর অর্থনীতির মূল কারণ


- শাকির আলম কোরেশী

আপডেট:০৪:০১, মে ২২ , ২০২০
photo

কিভাবে শুরু করি কথাটা বুঝতেছিনা !

লেখার বিষয় কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে ততটা নয়, যতটা না ব্যক্তিকেন্দ্রিক l একটা ফোন কল পেলাম দেশ থেকে l দুর্ভোগ, দুর্যোগের শঙ্কায় বলতেই হল, কি আর করার আছে , তাদেরকে সুযোগটা দিয়ে দাও l একেতো করোনার মহামারি, আয় উপার্জন নাই বললেই চলে, তার উপর রমজান মাস, কিছু ত্রাণ সংগ্রহ করতে পারলে খারাপ কি l রমজান পরে বাকি কাজটা যেন শেষ করে , কথাটা জানিয়ে রাখো l

কথা বলছিলাম গ্রামের গার্লস স্কুলের পেইন্টিং কাজে তদারকির দায়িত্বে থাকা এক ভাতিজার সাথে l পেইন্টাররা নাকি এখন আর কাজ করবে না l ত্রাণ নিয়ে দেশি বিদেশি দানবীররা দৌড়াদৌড়ি করছেন l তাই তাদেরকে লাইনে দাঁড়াতে হবে l কাজে থাকলে কর্মক্ষম বলে হয়তো করোনায় ততটা করুনা মিলবে না, এই ভয়ে কর্মহীনদের লিস্টে থাকাই শ্রেয় l তাই সাময়িক কর্মবিরতি l তাদের এই কর্মবিমুখতা যেন আজন্ম না হয় সেটাই হোক সবার প্রত্যাশা l মাশা’ল্লাহ এবার করোনার দুর্যোগ মহামারীতে সামাজিক দায়িত্ববোধে দেশি বিদেশীদের মহানুভব সুদৃষ্টির কথা স্মরণীয় হয়ে থাকবে দীর্ঘকাল l

তবে বিশেষ কোন পরিস্থিতি ব্যাতিরেকে এ রকম দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা অর্থাৎ খয়রাত প্রাপ্তির ধারাবাহিক প্রত্যাশা খুবই দুঃখজনক l কখনো তেমন কোন ব্যতিক্রম পরিস্থিতির উদ্ভব হলে অবশ্যই আমাদের সবাইকে একে অন্যের তরে এগিয়ে আসতে হবে l এটা যে শুধু ইসলামে সওয়াবের কাজ এমন না, ধর্ম, বর্ণ ও জাতি নির্বিশেষে দুর্যোগকালীন সময়ে একে অন্যের প্রতি হাত বাড়ানো আমাদের বহুমাত্রিক সমাজে সামাজিক দায়বদ্ধতাও বটে l তবে এই প্রত্যাশায় যথারীতি দীর্ঘকাল কর্মহীন বনে যাওয়ার প্রচেষ্টা কিন্তু আর্থসামাজিক অবক্ষয়ের পথে হাঁটার নামান্তর l

প্রাসঙ্গিকতায় আমার এক প্রবাসী বন্ধুর সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরছি এখানে l প্রায়ই তার কাছে নিজ এলাকার কিছু যুবক দেশ থেকে সাহায্য প্রার্থী হয় l একই ব্যাক্তি বছরে বার কয়েক বিভিন্ন অজুহাতে আবদার নিয়ে আসায় তাদেরকে আত্মনির্ভরশীল করার উদ্যোগ নেয় সে l বেশ ক'বছর ধরে ব্রিটেনে গার্মেন্টস পণ্য সামগ্রী এশিয়ান কমিউনিটির বুটিক হাউস গুলিতে সাপ্লাই করে বেশ বড় ধরণের বাজার তৈরী করেছে l আট দশজন কর্মী বারোমাস কাজ করে এমন একটি সেলাই কারখানা দেশে বছর দুয়েক ধরে চালাচ্ছে l বেশ ভালোই চলছে l অদূর ভবিষতে খানিকটা বড় আঙ্গিকে কারখানাটিকে সম্প্রসারণের ইচ্ছা রয়েছে তার l সব কিছুই কিন্তু নিকট আত্বীয় বেকার তরুণ যুবকদের স্বনির্ভরতাকে ঘিরে , তাদের পরিবারকে কিছুটা দারিদ্রমুক্ত করার উচ্চাকাঙ্খা নিয়ে l স্বপ্ন বাস্তবায়নে সে ইতিমধ্যে কারখানাটি গ্রামের বাজারে স্থানান্তর করেছে l দুই তিন সপ্তাহের ট্রেনিং শেষে মাসিক দশ হাজার টাকার অফার দিয়েও বেকার কাউকে চাকরিতে আনতে পারেনি l বরং অপ্রত্যাশিত এক বাহানায় তারা সবাই অপারগতা প্রকাশ করে l

সমস্যা কিন্তু অন্য জায়গায় l বিষয়টির একটু গভীরে গেলেই দেখবেন এর পিছনের ভিন্ন কারণ l বহুলাংশে দায়ী কিন্তু আমরা বিদেশীরাই l সকাল হলেই বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানো,আর বিকেলে নৌকা- ধানেরশীষ নিয়ে বাজার গরম করাই তো তাদের দৈনিন্দন কাজ l দশ হাজার টাকা বেতনে তারা রুটিনের বেড়াজালে চাকরি করবে কেন, যেখানে প্রতি মাসে দশ পনেরো হাজার টাকা বিভিন্ন অজুহাতে দান খয়রাত হিসেবে তাদের পকেটে আসে l নিজের অনুসারী বা নিজের নামে শ্লোগান তোলার জন্যই তো সময়ে সময়ে আমরা অনেকেই তাদেরকে পকেটমানি দিয়ে পরিবারের প্রতি দায়বদ্বতা থেকে সরিয়ে রাখছি l কেনইবা অন্যের নামে কুৎসা রটানোর জন্য নিয়মিতভাবে হাত খরচা দিয়ে নিজের নামে গ্রুপ তৈরী করছি l আমরা কি কখনো চিন্তা করছি যে তারও একটি পরিবার আছে, সংসার আছে l মা-বাবা, ভাই-বোন নিয়ে জীবন সংগ্রামে তাকে তো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে l প্রয়োজন ফুরালে তাদের খোজ নেওয়ার অভ্যাস কি আছে আমাদের ? এই সামান্য জ্ঞান বুদ্ধিটুকুও যেন আমাদের চিন্তা চেতনায় অবশিষ্ট আছে বলে মনে হয়না l দারিদ্রতার হাত থেকে রক্ষা পেতে তাকেও তো স্হায়ীভাবে কিছু একটা করতে জীবন সংগ্রামে নামতে হবে l আমরা কি তাদেরকে সেভাবে দারিদ্রমুক্ত করতে সহায়তা করছি ? পরিবার কেন্দ্রিক অতি দরিদ্র পর্যায়ে প্রান্তিক মানুষকে কৃষিবান্ধব করতে "একটি বাড়ি একটি খামার "এর ধারণায় কি তাদেরকে সহায়তা দিয়ে উদ্বুদ্ধ করছি ? ভবঘুরে স্বভাবের জন্য তারাও যে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য দায়ী, বিষয়টি অস্বীকার করার অবশ্য কোন সুযোগ নেই l এমন কি তাদের পরিবারের কর্তাব্যক্তি পর্যন্ত নিজের পায়ে দাঁড়াবার নূন্যতম চেষ্টাটুকু করতে চায় না l দান খয়রাতের প্রতি তাদের এত নির্ভরশীলতা যেন একটি অনুমোদিত পেশা হিসেবে স্বীকৃতি নিতে যাচ্ছে l

সাম্প্রতিক কভিড-19 মহামারীতে কিন্তু নির্দিষ্ট কোন দেশ, জাতি বা বর্ণভিত্তিক কোন গোষ্ঠী এককভাবে আক্তান্ত হয়নি l বরং এটি একটি বৈশ্বিক মহামারী l সবচেয়ে বড় উদ্বেগের ব্যাপার আমাদের মতো অনুন্নত দেশের বিভিন্ন পেশার শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে , যেখানে উন্নত বিশ্বই করোনার ভয়াবহ ছোবলে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত, অসহায় ও আতঙ্কগ্রস্থ l বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় সকল বাংলাদেশিরা ইতিমধ্যে অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে শংকিত l উন্নত বিশ্বের স্টেট পলিসির বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আজ আমাদের প্রায় সবাইকে মর্টগেজ, রেন্ট, রেইট সহ সব দেনা বন্ধ করে পেমেন্ট হলিডে নিতে হয়েছে l যেখানে মাত্র তিন মাসের কর্মহীনতায় অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ সকল মানুষই স্থবির হয়ে পড়েছে, সেখানে কর্মহীন মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে নিজেকে এখনই ভেবে দেখতে হবে l মানুষ কি নিজের আত্বকর্মসংস্থানের ব্যাপারে সচেষ্ট হবে না ? চ্যারিটির চাকা যে অনন্তকাল নাও ঘুরতে পারে, সেটা কি ভাবনায় আছে ? যারা সাধারণত দান খয়রাত করেন, ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দিয়ে থাকেন, সামান্য ক'দিনের মহামারীতে তো আজ তারাই অনেকটা কুপোকাত l দুর্ভাগ্যক্রমে যদি এ মহামারী কিছুটা দীর্ঘস্হায়ী হয়, থমকে যাওয়া অর্থনীতিতে সমাজ সভ্যতায় আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত পরিবার ও প্রতিষ্ষ্ঠানকে ঠিকে থাকতে হলে নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থানের ব্যাবস্হা করতে হবে l অন্তত বেকার তরুণ যুবকদের সকল ঋতুর প্রান্তিক কৃষিতে মনোযোগী হতে হবে l ভবঘুরে স্বভাব পরিহার করে পতিত জমি, বাড়ির অব্যবহৃত জায়গা, পরিত্যাক্ত জলাশয় ও পুকুরকে ঘিরে "একটি বাড়ি একটি খামার " এই ধারণার আওতায় মৎস্য, কৃষি ও রবি শস্য উৎপাদন ব্যাতিরেকে সম্ভাব্য দুর্যোগ দুর্ভিক্ষে পরিবার নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবার কোন সুযোগ আছে বলে মনে হয় না l কাজেই আমরা সবাই ব্যাক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নিজেদের স্বার্থেই ইনকাম জেনারেটের দিকে যেন অবশ্যই মনোযোগী হই l

শাকির আলম কোরেশী, নিউক্যাসল. Shakiralom1973@yahoo.co.uk



সাম্প্রতিক খবর

ডা: জাফরউল্লাহ চৌধুরীর জন্য লন্ডনে দোয়া মাহফিল

photo ঔষধ প্রশাসনের ভূমিকা নিতান্ত বাড়াবাড়ি ও বিরক্তিকর লন্ডনবিডিনিউজ২৪ঃলন্ডন, ২৭ শে মে বুধবার লন্ডন ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন রাইটস মুভমেন্ট ইউকে’র উদ্যোগে গত বুধবার ডা: জাফরউল্লাহ চৌধুরী’র আরোগ্য কামনায় এক দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় । রাইটস মুভমেন্ট ইউ কে’র আহবায়ক অধ্যাপক আব্দুল কাদির সালেহ এর সভাপতিত্বে এবং বিশিষ্ট সাংবাদিক শামসুল আলম লিটনের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত দোয়া মাহফিলে

বিস্তারিত

0 Comments

Add new comment